রুপবাণী ডেস্ক ৩ অগাস্ট ২০২৬ , ৫:২০ এএম প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার। সমুদ্রের নীল জলরাশি আর আকাশ ছোঁয়ার রোমাঞ্চের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিদিন শত শত পর্যটককে আকৃষ্ট করছে প্যারাসেইলিং। তবে, সেই রোমাঞ্চ ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে। একের পর এক দুর্ঘটনায় পর্যটকের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি, মানসম্মত পরিচালনা কিংবা জবাবদিহিমূলক কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই বিনোদন এখন পর্যটকদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানা গেছে, কক্সবাজারের দরিয়ানগর, হিমছড়ি ও ইনানী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একাধিক প্রতিষ্ঠান প্যারাসেইলিং পরিচালনা করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেই প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রশিক্ষিত জনবল, আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম কিংবা জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা। দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের অভিযান ও কঠোর অবস্থানের ঘোষণা এলেও কিছুদিন পর আবারো আগের মতো কার্যক্রম শুরু হয়। এতে নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অভিযোগ পর্যটক ও স্থানীয়দের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারের দরিয়ানগর, হিমছড়ি ও ইনানী এলাকায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ছয়টি প্যারাসেইলিং পরিচালনা করে আসছে। জেলা প্রশাসনের দাবি, এসব কার্যক্রম পরিচালনার কোনো অনুমোদন তারা দেয়নি। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও কিছুদিন পরই আবার তা চালু হয়ে যায়।
সর্বশেষ বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত সোমবার থেকে প্যারাসেইলিং বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও দরিয়ানগরের ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেলিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান সেই নির্দেশনা অমান্য করে কার্যক্রম চালিয়ে যায়। শনিবার ওই প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে আকাশ থেকে সমুদ্রে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারান খুলনার পর্যটক অক্ষর শৌভিক রায় (৩০)। এ ঘটনার পর আবারো প্রশ্ন উঠেছে অনুমোদন ছাড়াই কীভাবে বছরের পর বছর এমন ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং এর দায় কার?
এ ব্যাপারে ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেলিং-এর মালিক মোহাম্মদ ফরিদ মোবাইলে বলেন, “আমি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় অবস্থান করছি। এই মুহূর্তে কথা বলতে পারছি না।”
প্যারাসেইলিংয়ে বাড়ছে মৃত্যু ঝুঁকি
পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনার পর প্যারাসেইলিংয়ের অন্য প্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্মীরা পলাতক থাকায় তাদের বক্তব্য জানা যায়নি।
দরিয়ানগরের বাসিন্দা মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, “দুর্ঘটনা ঘটলেই কয়েকদিন প্রশাসনের অভিযান চলে। এরপর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসাটাই যেন এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
প্রশিক্ষণহীন কর্মী, ঝুঁকিতে পর্যটকের জীবন:
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্যারাসেইলিং পরিচালনায় নিয়োজিত অনেক কর্মীরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নেই। অনেকেই অভিজ্ঞ কর্মীদের কাজ দেখে অল্প সময়ের মধ্যেই পর্যটকদের নিয়ে উড্ডয়নের দায়িত্ব পালন করছেন। বৈরী আবহাওয়া, বাতাসের গতিপ্রকৃতি, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব থাকায় প্রতিটি রাইডই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ. ন. ম. হেলাল উদ্দিন বলেন, “প্যারাসেইলিং একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস। এটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষিত অপারেটর, নিয়মিত নিরাপত্তা যাচাই এবং কঠোর তদারকি অপরিহার্য। এসব নিশ্চিত না করে মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
নিরাপত্তা সরঞ্জামের মান নিয়ে প্রশ্ন:
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্যারাসেইলিংয়ে ব্যবহৃত লাইফ জ্যাকেট, হারনেস, দড়ি ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জামের মান নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ও ক্ষয়প্রাপ্ত দড়ি ব্যবহার করা হয়। নিয়মিত যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা নির্ধারিত সময় পর সরঞ্জাম পরিবর্তনের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।
অথচ, আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে প্রতিদিন উড্ডয়নের আগে সরঞ্জাম পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। কক্সবাজারে তা কতটা অনুসরণ করা হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন।
প্যারাসেইলিংয়ে কাজ করা শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ না থাকার অভিযোগ রয়েছে
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ. ন. ম. হেলাল উদ্দিন বলেন, “লাইফ জ্যাকেট, হারনেস, রশি ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে এবং নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। ব্যবহৃত সরঞ্জামের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে তা পরিবর্তন বাধ্যতামূলক। তবে, এসব বিষয়ে কার্যকর তদারকি না থাকায় পর্যটকরা অজান্তেই বড় ঝুঁকি নিয়ে রাইড করছেন।”
বিকল্প উদ্ধারব্যবস্থার অভাব:
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যারাসেইলিং পরিচালনার সময় দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার নিশ্চিত করতে অন্তত একটি অতিরিক্ত স্পিডবোট প্রস্তুত রাখা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের অংশ। কক্সবাজারের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এমন কোনো বিকল্প উদ্ধারব্যবস্থা নেই।
অভিযোগ রয়েছে, একটি স্পিডবোট দিয়েই পর্যটককে টেনে উড়ানো এবং দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধার দুই কাজই করা হয়। ফলে মাঝ আকাশে দড়ি ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা পর্যটক সাগরে পড়ে গেলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়। এতে প্রাণহানির ঝুঁকি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।
কক্সবাজার হোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, “দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার নিশ্চিত করতে অবশ্যই আলাদা ব্যাকআপ স্পিডবোট, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একটি স্পিডবোট দিয়ে উড্ডয়ন ও উদ্ধার- দুই কাজ করাটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”
কয়েক মিনিটের রোমাঞ্চে হাজার টাকার বাণিজ্য:
পর্যটকদের অভিযোগ, মাত্র কয়েক মিনিটের একটি রাইডের জন্য দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে আধা কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে এক বা দুইবার চক্কর দিয়ে রাইড শেষ করা হয়। ভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিরাপত্তা, সেবার মান কিংবা যাত্রীদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্রিফিং নিশ্চিত করা হয় না। এ ছাড়া কোনো নির্ধারিত মূল্যতালিকা কিংবা কার্যকর সরকারি তদারকি না থাকায় ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
কক্সবাজার হোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম আরো বলেন, “পর্যটকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ভাড়া নেওয়া হলেও নিরাপত্তার মান সে অনুযায়ী নয়। সেবার মান, নির্ধারিত ভাড়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।”
একের পর এক দুর্ঘটনা, তবু থামেনি ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম:
গত বছরের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে এক পর্যটক ঝাউগাছের ডগায় আটকে দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিলেন। ২০২৫ সালের ২০ মে এক পর্যটক দম্পতি সমুদ্রে ছিটকে পড়ে আহত হন। একই বছরের আরেক ঘটনায় এক নারী পর্যটকও সমুদ্রে পড়ে আহত হন।
প্রতিটি ঘটনার পর প্রশাসন সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিলেও কিছুদিন পরই আবার চালু হয়েছে প্যারাসেইলিং। সর্বশেষ শনিবারের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রমাণ করেছে, আগের কোনো ঘটনার পরই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দৃশ্যমান ও স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি।
প্যারাসেইলিংয়ের কাজে ব্যবহৃত স্পিডবোড
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক এইচএম নজরুল ইসলাম, “প্রতিটি দুর্ঘটনার পর সাময়িক অভিযান নয়, স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। অনুমোদন, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে না পারলে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটবে এবং দেশের পর্যটন শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
পর্যটকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ:
ময়মনসিংহ থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক সাইফুল ইসলাম বলেন, “প্যারাসেইলিং করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনার খবর দেখে সাহস পাইনি। পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসে যদি জীবনের নিরাপত্তাই না থাকে, তাহলে এমন রোমাঞ্চের কোনো মূল্য নেই।”
শরীয়তপুর থেকে আসা পর্যটক রিমি আক্তার বলেন, “টাকা নেওয়ার সময় সবাই খুব আন্তরিক। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে তেমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আকাশে তুলে দেওয়া হয়। দুর্ঘটনা ঘটলে কী হবে, সে বিষয়ে কেউ কিছু বলে না।”
স্থানীয়দের অভিযোগদুর্ঘটনার পরই কেবল তৎপরতা:
দরিয়ানগরের স্থানীয় বাসিন্দা আনিসুর রহমান উদ্দিন বলেন, “অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসাটাই যেন এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান নেয়া দরকার।”
কক্সবাজারের একটি প্যারাসেইলিং পয়েন্ট
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা নুরুল আবছার বলেন, “প্রতিদিন শত শত পর্যটক প্যারাসেইলিং করছেন। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। বড় দুর্ঘটনা না ঘটলে যেন কেউ নড়ে না।”
কঠোর নীতিমালা ও জবাবদিহি জরুরি:
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ. ন. ম. হেলাল উদ্দিন বলেন, “প্যারাসেইলিং পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত অপারেটর, নিয়মিত যন্ত্রপাতি পরীক্ষা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা বাধ্যতামূলক। কক্সবাজারে এসবের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সরকারকে দ্রুত একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এমন দুর্ঘটনা আরও ঘটবে, যা দেশের পর্যটন শিল্পের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।”
প্রশাসনের অবস্থান:
পর্যটন শাখার দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, “বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত সোমবার থেকেই প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দেশনা মেনে কার্যক্রম বন্ধ রাখলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে কার্যক্রম চালিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “জেলা প্রশাসন থেকে প্যারাসেইলিং পরিচালনার কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর অনির্দিষ্টকালের জন্য কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”











