রুপবাণী ডেস্ক ৮ অগাস্ট ২০২৬ , ১:০১ পিএম প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরের তিন দিন বাংলাদেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না, যার জের ধরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল চরম বিশৃঙ্খলা।

আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির মধ্যে তখন দেশের বিভিন্ন কারাগারে সংঘাত ও বন্দিদের পলায়নের ঘটনাও ঘটেছিল।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আটই আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের শপথ পড়ান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
কিন্তু এসব সিদ্ধান্তগুলো কারা কীভাবে নিয়েছে সেটি এখনো অনেকের কাছে বড় প্রশ্ন।
তবে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ‘অনতিবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে এবং পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করবে।’
তিনি তার ভাষণে জানান যে, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী অনতিবিলম্বে বর্তমান সংসদ বিলুপ্ত করা হবে এবং ‘সর্বসম্মতিক্রমে’ বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছিলেন যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সমস্ত রাজনৈতিক দল কাজ করবে, ছাত্র নেতারা কাজ করবে।
ডেটলাইন ৫ আগস্ট
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘিরে গণআন্দোলনের মুখে পাঁচ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তার যাওয়ার খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে এবং এরপর হাজার হাজার মানুষ গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকে পড়ে। সেখানে ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ঢাকায় আওয়ামী লীগের একাধিক কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরসহ অনেক থানায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনাও জানা যায়।
১৭ দিন ধরে কারফিউ থাকার পর তা পরদিন থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছিল আইএসপিআর।
৬ আগস্ট মঙ্গলবার থেকে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা খুলে দেওয়ার কথাও জানানো হয়।
রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের পর ৫ আগস্ট বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এখন একটি ইন্টেরিম গভর্মেন্ট গঠন করে আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করবো।’
সেদিন বিকালে তিন বাহিনী প্রধান, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা আর কয়েকজন ছাত্র প্রতিনিধি বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ওই বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, তাদের আলোচনায় কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত দেওয়া, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়া।
বঙ্গভবনের বৈঠকটি রাত আটটা নাগাদ শেষ হয়ে যায়।
অনেকটা একই সময় সার্ক ফোয়ারা এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, তারা পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার একটি অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব করবেন এবং তাদের সমর্থিত বা প্রস্তাবিত ছাড়া কোনো সরকার তারা সমর্থন করবেন না।
ডেটলাইন ৬ আগস্ট
এদিন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধান ও ছাত্র প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি, যার ফলে গঠিত হওয়ার সাত মাসের মাথায় এই সংসদ বাতিল হয়ে যায়।
পহেলা জুলাই থেকে পাঁচ আগস্ট পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার আন্দোলনকারী, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর আগে আটক নেতাকর্মী মিলিয়ে ২২০০র বেশি ব্যক্তিকে এদিন জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।
ঢাকা বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয় শেখ হাসিনা সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে।
আগের দিন পুলিশ সদর দপ্তর এবং দেশের বহু জায়গায় থানায় হামলার ঘটনার পর এদিন ডিবি অফিসসহ পুলিশের অনেক কার্যালয় ও থানা, সড়কে কোনো পুলিশ সদস্য দেখা যায়নি। পুলিশের অনুপস্থিতিতে তাদের দায়িত্ব পালনের স্থানগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয় আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে।
ঢাকার অধিকাংশ রাস্তায় কোনো ট্রাফিক পুলিশ দেখা যায়নি সেদিন। সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
বাংলাদেশের কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের সংগঠন পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন ‘পুলিশ সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত’ না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দেয়।
পুলিশ দায়িত্বে না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনোরকম কার্যক্রম ছিল না। ফলে অনেক এলাকায় ডাকাতি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষজনকে বিভিন্ন এলাকায় দল বেঁধে, রাত জেগে পাহারা দিতে দেখা যায়।
রাস্তায় কোনো ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের পথে পথে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের কাজ করতে দেখা যায়। পরের কয়েকদিন ধরে একই চিত্র দেখা গেছে।
ওইদিনই পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের চুক্তি বাতিল করে নতুন আইজিপি হিসেবে মো. ময়নুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও জবাবদিহি নিশ্চিতের আহ্বান জাতিসংঘের জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক।
এদিন কারারক্ষীদের জিম্মি করে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে ২০৯ জন বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন, এমন বেশ কয়েকজনের ফিরে আসার তথ্য জানা যায়। তাদের গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছিল বলে তারা জানান।
ডেটলাইন ৭ আগস্ট
এদিন সেনাপ্রধান জানান যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথ গ্রহণ বৃহস্পতিবার (৮ই আগস্ট) বিকালে অথবা সন্ধ্যায় হতে পারে। ওদিকে ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে ঘোষিত ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ও নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের রায় বাতিল করে শ্রম আপিলেট ট্রাইব্যুনাল। আওয়ামী লীগ আমলে ওই দণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
কুষ্টিয়া জেলা কারাগার থেকে দুপুরে গেট ভেঙে ৯৯ জন বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় কারারক্ষীরা ফাঁকা গুলি ছুঁড়লে বেশ কিছু বন্দি আবার ভেতরে চলে যায়।
এদিন ঢাকার নয়াপল্টনে বিশাল সমাবেশ করে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানায় বিএনপি। এই সভায় বহু বছর পর ভার্চুয়াল বক্তব্য দেন তখনকার দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে পুলিশের ভূমিকার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে নবনিযুক্ত আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম সব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
র্যাব মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনারসহ চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। তবে দেশজুড়ে নৈরাজ্য ও সহিংসতা ওইদিনও চলছিল।
ডেটলাইন ৮ আগস্ট
এদিন ফ্রান্স থেকে ঢাকা ফেরার পর ড. ইউনূসকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন তিন বাহিনী প্রধান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।
দেশে ফিরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই হবে প্রথম কাজ। বিভিন্ন জায়গায় হামলা বা আক্রমণ ষড়যন্ত্রের অংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ সবাইকে রক্ষা করা। প্রতিটি মানুষ আমাদের ভাই, আমাদের বোন। তাদেরকে রক্ষা করা এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আমাদের প্রথম কাজ।’
এর আগেই ঢাকায় সেনাসদরে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধান, নবনিযুক্ত পুলিশের আইজিপি, র্যাবের মহাপরিচালক এবং ডিএমপি কমিশনারের বৈঠকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেনাবাহিনীর সহায়তায় দেশের সকল থানার কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠকে সারাদেশে অরাজকতা, অগ্নি সংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান তখনকার বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান।
বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা সেন্টার এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে বলে জানান সেখানকার কর্মকর্তারা।
দেশের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকাসহ বেশকিছু এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও গণডাকাতির খবরও পাওয়া যায়।
অবশেষে তিনদিন সরকার শূন্য অবস্থায় থাকার পর শপথ নেয় দেশের নতুন সরকার।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ৮ আগস্ট বঙ্গভবনের দরবার হলে তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান তখনকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
একই সঙ্গে ১৩ জন উপদেষ্টাও শপথ নেন। এতে ঠাঁই পান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। উপদেষ্টা হিসেবে মোট ১৬ জনের নাম ঘোষণা হলেও তিন জন ঢাকার বাইরে থাকায় সেদিন শপথ নিতে পারেননি।





