জাতীয়

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষায় সংবিধান সংশোধনে নতুন যাত্রা

  রুপবাণী ডেস্ক ৪ অগাস্ট ২০২৬ , ১২:৫৮ পিএম প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি। কমিটি বলছে, সংবিধান সংশোধন কোনো একক পক্ষের সিদ্ধান্তে নয় বরং জুলাই আন্দোলনের সব অংশীজন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত করা হবে।

মঙ্গলবার (৪ জুলাই) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

সূত্র জানায়, বৈঠকে কমিটির একাধিক সদস্য জানান, সংবিধান সংশোধন কেবল একটি আইনগত প্রক্রিয়া নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রতিফলিত করার একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব। এমন একটি সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করতে চায় কমিটি, যেখানে দেশের সাধারণ মানুষও নিজেদের অংশীদার মনে করবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা সুফল বয়ে আনবে।

সংবিধান সংশোধনের আগে জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা, জুলাই আন্দোলনে নিহত পরিবারের সদস্য, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধি, শিক্ষক প্রতিনিধি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংগঠনের সদস্য, বিরোধীদলের সদস্য এবং অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানান কমিটির সদস্যরা। তারা বলেন, জুলাই সনদকে ভিত্তি করেই এগোবে প্রক্রিয়া।

বৈঠকে বিশেষ কমিটির সদস্যরা অভিমত দেন, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াটি এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মনে করেন এই সংবিধান তাদেরও।

কমিটির লক্ষ্য হচ্ছে, সংশোধিত সংবিধানে জনগণের অধিকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আরও সুসংহত করা। একইসঙ্গে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে একটি টেকসই সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করা।

বিশেষ কমিটিতে যারা রয়েছেন 
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আন্দালিব রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংসদ সদস্য সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয় ঐকমত্য সবচেয়ে বড় শক্তি
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেন, “সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সংশোধিত সংবিধান দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।”

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন
বৈঠকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “সংবিধান সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়া হবে আইনসম্মত, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক। জুলাই আন্দোলনের যে গণআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা সাংবিধানিক কাঠামোয় যথাযথভাবে প্রতিফলিত করাই হবে এই কমিটির অন্যতম দায়িত্ব।”

সব পক্ষের কথা শোনা হবে
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, “সংবিধান এমন একটি দলিল, যা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের। তাই জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবীদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।”

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই সংবিধান
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, “শুধু বর্তমান সময়ের প্রয়োজন নয়, আগামী কয়েক দশকের রাষ্ট্রীয় চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় রেখেই সংবিধান সংশোধনের কাজ করতে হবে। একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সংবিধানই দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হবে।”

দল নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থই হবে অগ্রাধিকার
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, “সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে রাষ্ট্র ও জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য সব অংশীজনের মতামত গ্রহণ এবং উন্মুক্ত আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।”

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সংবিধান সংশোধনের আগে জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা, আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধি, শিক্ষক প্রতিনিধি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংগঠনের সদস্য, বিরোধীদলের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা করা হবে।

কমিটির সদস্যরা অভিমত দেন, সংশোধনের প্রক্রিয়াটি এমনভাবে পরিচালিত হবে, যাতে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মনে করেন এই সংবিধান তাদেরও। একই সঙ্গে জুলাইয়ের চেতনা ও জুলাই সনদকে ভিত্তি করেই সংশোধনের চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়ন করা হবে।

বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ও বিশেষ কমিটির সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।