আন্তর্জাতিক

লন্ডনে মুসলিম ঐক্যের প্রতীক ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও মরিয়ম সেন্টার

  রুপবাণী ডেস্ক ৬ অগাস্ট ২০২৬ , ৭:০০ এএম প্রিন্ট সংস্করণ

লন্ডনের ব্যস্ততম সড়ক হোয়াইটচ্যাপেল রোড। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর এই এলাকার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে ইস্ট লন্ডন মসজিদ। এটি শুধু একটি মসজিদ নয়, বরং যুক্তরাজ্যের মুসলিম সমাজের ধর্মীয়, সামাজিক, শিক্ষা ও মানবিক কার্যক্রমের অন্যতম বৃহৎ কেন্দ্র। পাশেই রয়েছে মরিয়ম সেন্টার, যা নারী, পরিবার ও কমিউনিটিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স। ইস্ট লন্ডন মসজিদ এবং মরিয়ম সেন্টার আজ শুধু পূর্ব লন্ডনের নয়, পুরো ইউরোপের মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা।

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য ইস্ট লন্ডন মসজিদে হাজারো মুসল্লি সমবেত হন। জুমার দিনে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। রমজান, ঈদ কিংবা বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পুরো মসজিদ কমপ্লেক্স মুসল্লিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। লন্ডনের সবচেয়ে বড় জুমার জামাতগুলোর একটি অনুষ্ঠিত হয় এখানেই।

ইস্ট লন্ডন মসজিদের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। ১৯১০ সালে লন্ডনে একটি স্থায়ী মসজিদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয় ‘লন্ডন মসজিদ ফান্ড’। দীর্ঘ তহবিল সংগ্রহের পর ১৯৪১ সালে কমার্শিয়াল রোডে প্রথম মসজিদ চালু হয়। পরবর্তীতে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় বর্তমান হোয়াইটচ্যাপেল রোডে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮৫ সালে বর্তমান ইস্ট লন্ডন মসজিদের উদ্বোধন হয়। এরপর ধাপে ধাপে যুক্ত হয় লন্ডন মুসলিম সেন্টার এবং মরিয়ম সেন্টার, যা পুরো কমপ্লেক্সকে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ইসলামিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

২০০৪ সালে উদ্বোধন করা হয় লন্ডন মুসলিম সেন্টার। এটি শুধু নামাজের জায়গা নয়, বরং শিক্ষা, সেমিনার, স্বাস্থ্যসেবা, যুব উন্নয়ন, দাওয়াহ কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের কেন্দ্র। প্রতি শুক্রবার প্রায় ১০ হাজার মুসল্লিকে ধারণ করার সক্ষমতা রয়েছে পুরো কমপ্লেক্সের।

ইস্ট লন্ডন মসজিদের পাশে অবস্থিত মরিয়ম সেন্টার

নারীদের জন্য পৃথক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালে শুরু হয় মরিয়ম সেন্টারের নির্মাণকাজ। ২০১৩ সালে উদ্বোধন হওয়া ৯ তলা এই ভবনে রয়েছে নারীদের জন্য বিশাল নামাজের স্থান, শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ কক্ষ, ফিটনেস সুবিধা, পরিবারভিত্তিক পরামর্শসেবা, শিশু পরিচর্যা এবং বিভিন্ন কমিউনিটি কার্যক্রমের ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের মুসলিম নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সক্রিয় সামাজিক পরিসর তৈরি হয়েছে।

ইস্ট লন্ডন মসজিদের সবচেয়ে মানবিক সেবাগুলোর একটি হলো জানাজা ও দাফন কার্যক্রম। প্রতিদিনই এখানে এক বা একাধিক জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব লন্ডনসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোনো মুসলিম মৃত্যুবরণ করলে তার স্বজনরা মরদেহ এই মসজিদে নিয়ে আসেন। এখানেই জানাজার নামাজ আদায় করা হয়, এরপর দাফনের জন্য বিভিন্ন কবরস্থানে নেওয়া হয়। ১৯৬০ সাল থেকে পরিচালিত হাজি তাসলিম ফিউনারেল সার্ভিস এই কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। মরিয়ম সেন্টারের বেজমেন্টে রয়েছে আধুনিক মর্গ সুবিধাও।

ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষা ও সমাজসেবায়ও ইস্ট লন্ডন মসজিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন শিক্ষা, ইসলামিক স্টাডিজ, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, যুব উন্নয়ন, পারিবারিক পরামর্শ, বিবাহ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, খাদ্য সহায়তা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মসূচি নিয়মিত পরিচালিত হয়। মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিমদের জন্যও উন্মুক্ত বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও সামাজিক উদ্যোগ এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, ভারতীয়, সোমালি, আরব ও তুর্কিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের মিলনস্থল এই মসজিদ। বিশেষ করে লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে ইস্ট লন্ডন মসজিদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক উদ্যোগ, জাতীয় দুর্যোগে সহায়তা এবং কমিউনিটি উন্নয়নের নানা কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুসলমানদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।

আজকের ইস্ট লন্ডন মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়। এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, মানবসেবা, শিক্ষা এবং বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের এক জীবন্ত প্রতীক। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করে চলেছে, একটি মসজিদ শুধু ইবাদতের কেন্দ্র নয়, একটি সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখারও শক্তিশালী ভিত্তি।